“দুমুঠো ভাতে সংগ্রামের গল্পকাহিনী; প্রান্তিক মানুষ স্বপ্নবুনে বেশ, ভেঙেচুরে নিলো সর্বগ্রাসী নদী; তীরের সম্বল ঘরটুকুও শেষ।”
বাংলাদেশে বন্যার পর নদী ভাঙ্গন অন্যতম একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ হিসেবে পরিচিত। নদী ভাঙ্গন বলতে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত নদীর জল প্রবাহের ফলে নদীর তীর বা পাড় এর ভাঙ্গনকে বোঝায়। নদী ভাঙ্গন বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্ব বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে বেশি ঘটে, যার ফলে ঘর-বাড়ি, ফসল জমি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ, গৃহপালিত প্রাণী, গাছপালা ইত্যাদি সব গ্রাস করে নিয়ে নেয়। ভূমিহীন, ঘরহীন, অন্নহীন হয়ে পড়ে প্রান্তিক মানুষগুলো। চারদিকে অস্তিত্বের সংকট ও হতাশা, প্রকৃতি যেনো তাদের প্রতি নির্দয়।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ যার পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী, তিস্তা, ব্রম্মপুত্র, করতোয়া, সুরমা, কীর্তনখোলা, ইছামতী ইত্যাদি ছোট-বড় প্রায় ৩০০ টি নদী রয়েছে। বাংলাদেশের মোট ৬৪ জেলার মধ্যে নীলফামারী, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, বরিশাল, ভোলা, কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুরসহ মোট ৫১টি জেলায় নদী ভাঙ্গনে প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার একর জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, বিডিপিসি এর রিপোর্ট অনুযায়ী, উদ্বাস্তু-গৃহহীন মানুষের ভাসমান সংখ্যা প্রতি বছর ২ লক্ষ ৫০ হাজার করে বাড়ছে। এতে, প্রান্তিক মানুষদের আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশের উপর নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
নদী ভাঙ্গন শুধু বাংলাদেশে নয় সারাবিশ্বে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। কিছু প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট কারণ যেমন:- ভূমিধস, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, জলের স্রোত, বালি উত্তোলন, নদীর তীরের গাছপালা কেটে ফেলা, অপরিকল্পিত নদী খনন ইত্যাদি কারণে নদী ভাঙ্গন হয়ে থাকে। নদী ভাঙ্গনের ফলে, জমি বিলীন হওয়া, ঘর-বাড়ি ভেসে যাওয়া, অর্থনীতি মন্দা, সামাজিক অস্থিরতা, কৃষি ফসল ডুবে যাওয়া, পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়া ইত্যাদি নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
নদী ভাঙ্গন প্রান্তিক মানুষদের জন্য একটি অভিশপ্ত প্রাকৃতিক দূর্যোগ। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবন দূর্বিষহ, বেকারত্ব, দারিদ্র্যতায় পিষে ফেলছে। তাঁরা মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জলসম্পদে বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে বন্যার পাশাপাশি নদী ভাঙ্গনে বলি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষগুলো। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রান্তিক মানুষগুলো যেনো জীবনযাপন করতে পারে ও তাদের অধিকারগুলো ভোগ করতে পারে সেজন্য নদী ভাঙ্গন রোধ করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই প্রকল্প গ্রহণ, জনগণকে নদী ভাঙ্গনের কারণ, প্রভাব এবং ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন, পরিকল্পিত নদী শাসন, বৈজ্ঞানিক ও উন্নত প্রযুক্তির পন্থা অবলম্বন, নদীর তীরে পরিকল্পিতভাবে গাছপালা রোপন, সুপরিকল্পিত উপায়ে ঘর-বাড়ি নির্মাণ, নদীর গতিপথ পরিবর্তন না করা ইত্যাদি পদক্ষেপগুলো গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরী।
লেখক
সুমন দাস,
সাবেক শিক্ষার্থী,
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ-৮১০০
Leave a Reply