“একই রক্ত-মাংসে মানুষ গড়া; নাহি করি হৃদয়ে জাতিভেদ,
সকল কর্মকে করবো সম্মান মোরা; মানবিক আচরণই মানবধর্মের আদেশ।”
নদীমাতৃক বাংলাদেশ সাগর, নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওর, ডোবা, পুকুর ইত্যাদি উন্মুক্ত ও আবদ্ধ জলাশয়ে পরিপূর্ণ। যারা মাছ ধরা, বাজারজাতকর ও মৎস বহির্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন কৃষি, দিনমজুর, জাল ও মাদুর তৈরির সাথে যুক্ত এবং বিশেষ করে নদীতীরবর্তী অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীবদ্ধভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট পাড়া বা বিভিন্ন গ্রামে বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছে তাদের জেলে বলে। ঐতিহ্যগতভাবে, বাংলাদেশের জেলেরা সনাতন ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে মুসলমানদের মৎস্য বিপণনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা লক্ষনীয় হওয়ায় সনাতন ধর্মের বর্ণপ্রথার মতোই তাদেরকে বিভাজিত করা হয়েছে। জেলেরা প্রতিকূল আবহাওয়ায় মধ্যে দিয়ে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে চলছে।
জেলেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে কিছু বিশ্বাস ও মূল্যবোধ রয়েছে যা তাদের আচার-অনুষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত। তাদের কর্মের কোনো বিচ্যুতি ঘটলে তা অধর্ম বা পাপ বলে মনে করে। তারা মৎস্য আহরণ বৃদ্ধি ও বিপদমুক্ত কাজ করার জন্য গঙ্গা পূজা করে থাকে। এমনকি, মুসলমান জেলেরা পেশা জীবনে সফলতা ও নিরাপত্তার জন্য ধর্মীয় প্রার্থনা, মিলাদ মাহ্ফিল আয়োজন, দরগায় শির্নি বা মানত করে থাকে। এসবের পাশাপাশি জেলেদের জীবনে রয়েছে গল্প ও কাহিনী, লোকাচার, ধাঁধা ও কৌতুক ইত্যাদি। এছাড়া, তাঁরা পল্লীগীতি, বাউল, ভাটিয়ালি ইত্যাদি গান গেয়ে কর্মের উদ্দীপনা পেয়ে থাকে। এ সকল উপাদান জেলেদের ঐক্য ও সংহতিকে দৃঢ় করতে সহায়তা করে থাকে। তবে দেখা যায়, জেলেদের অবস্থান সামাজিক স্তরে নিচু অংশে রাখা হয়। ফলশ্রুতিতে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাপে তাঁরা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।
বাস্তবতায় দেখা যায়, জেলেরা পরিবারের হাল ধরতে দিন রাত সাগর, নদী, হাওর, পুকুর ইত্যাদি বিভিন্ন জলাশয়ে বৈরী আবহাওয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে জীবন সংগ্রামের জন্য লড়ে যাচ্ছে। যেনো এই জীবনে তাদের সংসার, ধর্ম ও জীবিকা নির্বাহের কেন্দ্রবিন্দু হলো জলাশয়। তাই তাদের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, মিত্রতা সবকিছু জলাশয়কে ঘিরেই। তাদের হাজারো স্মৃতি ও গল্পকাহিনী রয়েছে জীবন নেওয়া ও দেওয়া এই জলাশয়ের সাথে। জেলেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান অন্যান্য পেশার মানুষদের থেকে নিচু বলে তাঁরা নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। যার ফলে, নানা সমস্যায় পড়ে যেমন:- দারিদ্র্য, ঋণদাতাদের চাপ, প্রাকৃতিক দূর্যোগ ইত্যাদি। আমাদের সকলের উচিত মানবতাকে উচ্চ স্থানে রেখে তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে তাদের সার্বিক দিক বিবেচনা করে সরকারের সহযোগিতার হাত বাড়ানো, জীবন ও সম্পদ সুরক্ষার ব্যবস্থা, শিক্ষার প্রসার, সচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদিতে জোড় দিলে বেঁচে থাকার নতুন পথ খুঁজে পাবে। তাহলেই, মানুষ স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক
সুমন দাস,
সাবেক শিক্ষার্থী,
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ-৮১০০
এ জাতীয় আরো খবর..
Leave a Reply